• শিরোনাম

    স্বীকৃতি না পাওয়ার কষ্ট আছিয়ার

    | বৃহস্পতিবার, ২৫ মার্চ ২০২১

    স্বীকৃতি না পাওয়ার কষ্ট আছিয়ার

    ২০-২২ জন আশ্রয় নিয়েছিলেন মাটির এক ঘরে। মা–বাবাসহ স্বজনদের সঙ্গে ছিলেন ১২ বছরের আছিয়া বেগমও। প্রথমে জানালা ভেঙে ঘরের ভেতরে বোমা নিক্ষেপ করে হানাদার বাহিনী। বোমার স্প্লিন্টার বিদ্ধ হয় আছিয়ার ডান পায়ের হাঁটুর নিচে। কিছুক্ষণ পরেই ঘরের দরজা ভেঙে ফেলে হানাদারেরা।

    চোখের সামনে আছিয়ার চার ভাই, বাবাসহ ১৫ জনকে গুলি করে হত্যা করে তারা। গুলিবিদ্ধ হন আছিয়া, তাঁর মা রতন নেছা ও বোন রাফিয়া। তবে সৌভাগ্যক্রমে তাঁরা বেঁচে যান। লাশের সঙ্গে মা ও দুই মেয়ে পড়ে ছিলেন তিন দিন তিন রাত। পরে বীর মুক্তিযোদ্ধারা তাঁদের উদ্ধার করে ভারতে নিয়ে যান।

    মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এই গণহত্যার কাহিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার বায়েক গ্রামের। ১৯৭১ সালের ২১ মে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞে ওই গ্রামে মোট ৩৯ জন প্রাণ হারান। লাশগুলো বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে ছিল। স্বজনদের বেশির ভাগই ভারতের আগরতলায় আশ্রয় নেন। দেশ স্বাধীনের পর গ্রামে ফেরেন।

    লাশের পরিবর্তে পান হাড় ও মাথার খুলি। চারপাশে রক্ত ও রক্তের পচা দুর্গন্ধ। স্বজনেরা হাড়গোড় কুড়িয়ে নিয়ে গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় কবর দেন। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও ওই গণহত্যায় নিহত লোকজন ও তাঁদের পরিবারের এ ত্যাগের স্বীকৃতি মেলেনি।

    সেদিনের ১২ বছরের কিশোরী আয়েশা এখন ৬২ বছরের প্রবীণ। বাঁ পায়ে স্প্লিন্টার ও ডান পায়ে গুলির আঘাতের চিহ্নটা এখনো স্পষ্ট। আজও খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটেন তিনি। আয়েশার মা রতন নেছা ও বোন রাফিয়া এখনো বেঁচে আছেন। সেদিনের স্মৃতি মনে পড়লে এখনো তাঁরা আঁতকে ওঠেন।

    আছিয়া বেগম বলেন, ‘মাটির ঘর নিরাপদ মনে কইরা আম্মা-আব্বা আমরারে পাশের ওয়াব আলীর বাড়িতে লইয়া যান। ছোট ভাই দুলাল (১) ও শাহাজাহানকে (৭) আমার দুই ঊরুর মধ্যে বসাইয়া রাখছিলাম। কিন্তু গুলি থেকেও হেরাও রেহাই পাইছে না। তাদের কপালে গুলি লাগছে।’

    ওই গণহত্যায় নিহত অন্যদের মধ্যে ছিলেন আয়েশার বাবা তৈয়ব আলী, অপর দুই ভাই মিজান ও সিরাজ, দাদা নায়েব আলী, দাদি সূর্যবান নেছা, দূরসম্পর্কের দাদা মুনসুর আলী, ফুফু আফিয়া খাতুন ও আয়শা খাতুন, নানা জব্বর আলী, নানি ফুল চান ও ফুফা তোতা মিয়া।

    আয়েশা বলেন, ‘তিন দিন তিন রাত মাটির ঘরে লাশের সঙ্গে আছিলাম। মুক্তিবাহিনীরা আমরারতে ভারতের আগরতলায় লইয়া গেছে। দেশ স্বাধীনের পর গ্রামে আইছি। তবে কোনো লাশ পাইছি না। হাড়, মাথার ঠুলি (খুলি) সব একত্র কইরা গ্রামের পুকুরের উত্তর দিকে কবর দিছি।’

    যে ওয়াব আলীর বাড়িতে আয়েশারা আশ্রয় নিয়েছিলেন, তাঁর স্ত্রী সূর্যবান নেছা (সূর্যবানু) আজও জীবিত। সেদিন তাঁর স্বামী ও দুই সন্তান ওই মাটির ঘরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। হানাদার বাহিনীর ব্রাশফায়ারে সূর্যবানুর ১০ মাস বয়সী শিশুছেলে ও আরেক ছেলে জালালের (৭) দেহ ঝাঁঝরা হয়ে যায়। একটা গুলি লাগে স্বামী ওয়াব আলীর বাঁ হাতে। গুলির আঘাতে হাতটা কনুইয়ের নিচের অংশ শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

    কিন্তু তিনি জীবিত ছিলেন। পাকিস্তানিরা মৃত ভেবে ওয়াবকে ফেলে চলে যায়। ঘটনার সময় সূর্যবানু কোনোমতে অপর দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে পড়েন। কয়েক দিন পরে মুক্তিবাহিনীর সহায়তায় তিনি যখন ভারতের আগরতলায় যাচ্ছিলেন, পথে স্বামী ওয়াবকে পান।

    সত্তরোর্ধ্ব সূর্যবানু আক্ষেপ করে বলেন, ‘২০-৩০ বছর ধইরা এসব কইতে কইতে বৃদ্ধ অইয়া গেছি। হেবলা আছিলাম পুরি (অল্পবয়সী), এখন হইছি বুড়ি। কিন্তু সরকারের কাছ থেইকা কোনো স্বীকৃতি পাইছি না।’

    সেদিন গণহত্যার শিকার গ্রামের আরেক পরিবারের সদস্য জজ মিয়া (৬০)। ফুফা ইউসুফ মিয়ার বাড়িতে তাঁর বাবা আসমত আলী, ভাই আবদুল মালেক, চাচাতো ভাই জহির উদ্দিন, বোনের স্বামী সেকান্দর আলী, ছেলে আবদুল গণিসহ ছয়জন আশ্রয় নিয়েছিলেন। পাকিস্তানিরা ওই বাড়িতে ঢুকে সবাইকে গুলি করে হত্যা করে।

    জজ মিয়া বলেন, ‘মা আছমাতুন্নেছার সঙ্গে আমি আগরতলা থেকে সালদা নদীর পূর্ব দিক দিয়ে গ্রামে ফিরতেছিলাম। কিন্তু একজন আত্মীয় আসতে দেননি। কয়েক দিন পর এসে দেখি বাড়ির উঠান ও ঘরের দরজায় রক্ত। বাড়ির দক্ষিণ দিকে বাবা-ভাইকে একত্রে ও অন্যদের বিভিন্ন জায়গায় দাফন করা হয়।’

    ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মুক্তিযুদ্ধ গবেষক জয়দুল হোসেনের লেখা মুক্তিযুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং গণহত্যা, বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ বই দুটিতে বায়েকের গণহত্যার বিভিন্ন তথ্য মেলে। এর বাইরে ওই গণহত্যার ঘটনা আজ প্রায় বিস্মৃত এক কাহিনি। শহীদদের স্মরণে বায়েক গ্রামের চৌমুহনী মোড়ে ২০১৬ সালের জুন মাসে একটি তোরণ নির্মাণ করে জেলা পরিষদ। সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, ওই তোরণের কাছে একটি টিনের সাইনবোর্ড ঝোলানো

    । তাতে ৩৯ জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও আহত ২৮ জনের নাম রয়েছে। নিজ খরচে প্রায় ১৫ বছর আগে সাইনবোর্ডটি ঝুলিয়ে দেন আবদুল বারেক। তিনি স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত বেশির ভাগ নির্বাচনে বায়েক ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) স্থানীয় ওয়ার্ডের সদস্য হয়েছেন। সাইনবোর্ডটিতে ইতিমধ্যে মরিচা ধরেছে। ফলে অনেক নাম মুছে গেছে।

    ইউপি সদস্য আবদুল বারেক প্রথম আলোকে বলেন, বায়েক গণহত্যায় যাঁরা শহীদ হয়েছেন, তাঁরা স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও কোনো স্বীকৃতি পাননি। তাঁদের পরিবারগুলোও রয়েছে অবহেলিত। শহীদদের যথাযথ স্বীকৃতি ও তাঁদের পরিবারগুলোকে মূল্যায়নের পাশাপাশি এই স্থানে সরকারি উদ্যোগে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের দাবি জানান তিনি।

    বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের বায়েক ইউনিয়ন শাখার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবদুল গণি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওই দিন ৩৯ জনের সঙ্গে আমার বাবা আবদুর রাজ্জাককেও হত্যা করা হয়। তালিকায় বাবার নাম রয়েছে। কিন্তু তাঁদের ত্যাগের কোনো মূল্যায়ন হয়নি। আমাদের দাবি, সরকার যেন তাঁদের ত্যাগকে স্বীকৃতি দেয়।’

    ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসক হায়াত-উদ-দৌলা খান প্রথম আলোকে বলেন, বায়েক গণহত্যায় শহীদদের স্বীকৃতির বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    Test

    ১৫ মার্চ ২০১৮

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
  • ফেসবুকে চিনাইরবার্তা.কম