• শিরোনাম

    ভ্যাকসিন নিয়ে অনাগ্রহ দূর করতে কী করবে সরকার?

    | বুধবার, ২৩ ডিসেম্বর ২০২০

    ভ্যাকসিন নিয়ে অনাগ্রহ দূর করতে কী করবে সরকার?

    করোনাভাইরাসের প্রতিষেধকের বিষয়ে মানুষের আগ্রহ থাকলেও টিকা নেওয়ার বিষয়ে অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে। একাধিক চিকিৎসক, সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টিকা নিয়ে আগ্রহ থাকলেও নিজে টিকা নেওয়ার বিষয়ে তাদের ভিন্ন মত।

    নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চিকিৎসক জানান, করোনার এই ভ্যাকসিন নিতে তারা আগ্রহী নন। তাদের দাবি, ‘এটা ফার্স্ট জেনারেশন ভ্যাকসিন। আমাদের দেশে ইপিআই বা অন্যান্য ভ্যাকসিন যেগুলো নেওয়া হচ্ছে, তার বয়স নিদেনপক্ষে পাঁচ থেকে ১০ বছর অথবা তারও বেশি। আবার প্রতিবছর সেগুলো রিফাইন করা হয়, অ্যাডভান্স ইফেক্ট দেখে সেগুলোর এফিকেসি (কার্যকারিতা) বাড়ানোর জন্য গবেষণা করা হয়। কিন্তু যেখানে কিছু স্বাস্থ্যবিধি মেনে ভাইরাস প্রতিরোধ করা যেতে পারে, সেখানে সেখানে ভবিষ্যৎ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া না জেনে ভ্যাকসিন (ইনজেকশন) নেওয়ার কোনও মানে হয় না। এটা তো খাওয়ার ওষুধ নয় যে রক্তের সঙ্গে না মিশে বের হয়ে যাবে, কিন্তু এটা ইনজেকশন।’

    অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন ট্রায়ালে একজনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হওয়ায় ট্রায়াল বন্ধ করা হয়, যে কোনও ভ্যাকসিনের বেলায় এসব বিষয়কে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়।

    সারা পৃথিবীতে বর্তমানে ভ্যাকসিন নেওয়ার জন্য ‘হিড়িক’ পড়ে গেছে মন্তব্য করে চিকিৎসকরা বলছেন, ‘সবাই মনে করছেন এটা খুব ভালো, কিন্তু আমি মনে করছি এটা ‍হুজুগ। ভবিষ্যতে কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে সেখান থেকে বের হওয়া যাবে না।’

    সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা বলছেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে বারবার বলা হচ্ছে, যতদিন না ভ্যাকসিন আসছে ততদিন মাস্ক পরুন। এই বলে বোঝানো হয়েছে, ‘মাস্ক উইল বি রিপ্লেসড বাই ভ্যাকসিন’। কিন্তু এই কথা ঠিক নয়। ভ্যাকসিন আসার পরেও মাস্ক পরতে হবে, তাই অহেতুক ভ্যাকসিন নিতে যাবো কেন—প্রশ্ন চিকিৎসকদের। তাছাড়া ভ্যাকসিনের কার্যক্ষমতা কতদিন থাকবে সেটাও অজানা।

    আগামী জানুয়ারি মাসের শেষ দিকে অথবা ফেব্রুয়ারির শুরুতেই যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রেজেনেকার তৈরি করোনার ভ্যাকসিন বাংলাদেশে আসবে বলে আশা করছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। ইতোমধ্যে গত ১৩ নভেম্বর ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন আনার জন্য বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের সঙ্গে ভ্যাকসিন ক্রয় সংক্রান্ত চুক্তি সম্পন্ন করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।

    প্রতিটি মানুষের জন্য দুটি করে ডোজ প্রয়োজন হবে বলে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক গত রবিবার (২০ ডিসেম্বর) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তিন কোটি ডোজ একবারে আসবে না, ধাপে ধাপে আসবে। প্রথম ধাপে আসবে ৫০ লাখ ডোজ। এরপর প্রতি ধাপে ৫০ লাখ করে ভ্যাকসিন আসবে।

    কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যে কোনও ভ্যাকসিন যত দামি ভ্যাকসিনই হোক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রি-কোয়ালিফিকেশন লাগবে। কিন্তু অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন এখনও প্রি-কোয়ালিফিকেশন পায়নি। আবার ইংল্যান্ডসহ ইউরোপের সাতটি দেশের মধ্যেও সেটা যদি অনুমোদন হয়, সে দেশগুলোর কোনও একটাতেও যদি ব্যবহার শুরু হয়, তাহলে আমাদের আইনে রয়েছে আমাদের দেশের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর অনুমোদন দেবে। সেই আলোকে ডিসেম্বরের শেষে ভারতের রেগুলেটরি বডি অনুমোদন দেবে। তারপর অক্সফোর্ড যুক্তরাজ্য সরকার এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে অনুমোদন চাইবে। যখনই আমরা অনুমোদন শুনবো, তখনই সেটা আনা হবে।

    ভ্যাকসিন নিয়ে অনেকেরই অনাগ্রহ রয়েছে এটা সত্যি মন্তব্য করে অধ্যাপক ডা. শহীদুল্লাহ বলেন, ‘‘সারা পৃথিবীতেই এরকম মানুষ রয়েছে। এটা এ দেশেও হবে। পৃথিবীতে অনেক ‘অ্যান্টি ভ্যাকসিন ক্যাম্পেইন গ্রুপ’ রয়েছে, যেখানে ধর্মান্ধ যেমন রয়েছে তেমনি নানান ট্যাবু কাজ করে মানুষের মধ্যে। তারা খুব সক্রিয়, তবে বাংলাদেশ সেখান থেকে ভালো অবস্থানে রয়েছে।’’

    ‘কেউ স্বাভাবিকভাবে ইমিউন হওয়ার আশা করেন আর বিশেষ করে করোনা ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে অনেকের ধারণা, খুব তাড়াতাড়ি এই ভ্যাকসিন তৈরি হয়েছে, তাই ভবিষ্যতে তার কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে সেটা এখনও অজানা। একেকজনের একেক কারণ রয়েছে, সবার অনাগ্রহ কিন্তু এক কারণে নয়’—বলেন অধ্যাপক শহীদুল্লাহ।

    স্বাস্থ্য বিভাগের টিকা সম্পর্কিত কার্যক্রমের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যারা টিকা নেবে না তাদের প্রাথমিকভাবে বাইরে রেখে যারা টিকা নেবেন তাদের হলফনামা দিতে হবে যে এই ভ্যাকসিন তারা স্বেচ্ছায় নিচ্ছেন।’

    ভ্যাকসিন বিষয়ক গঠিত টাস্কফোর্স কমিটির সদস্য ডা. শামসুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভ্যাকসিন নিয়ে জেলা পর্যায়ে কমিটি করা হয়েছে, তাদেরকে দায়িত্ব দেওয়া হবে কীভাবে তারা কাজ করবেন। অধিদফতর যখন সবকিছু দিয়ে দেবে, তখন তারা সেভাবে কাজ করবে।’

    টিকা নিয়ে অনাগ্রহ কাজ করছে অনেকের মধ্যে, এ নিয়ে সরকারের কোনও পরিকল্পনা রয়েছে কিনা জানতে চাইলে ডা. শামসুল হক বলেন, ‘সেটা থাকতেই পারে। আর এটা পুরোটা নির্ভর করবে যখন টিকার সব তথ্য আমরা পেয়ে যাবো।’

    কিন্তু আমরা যদি মানুষকে বোঝাতে পারি মানুষের কোনও অনাগ্রহ থাকবে না মন্তব্য করে ডা. শামসুল হক বলেন, ‘আমরা পজিটিভ আছি, এ নিয়ে প্রচারণা চালানো হবে, কাজ করবো আমরা। তবে মানুষের শরীরের ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করে।’

    তবে স্বাস্থ্য অধিদফতরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভ্যাকসিন নিয়ে সব তথ্য পেতে হবে, কিন্তু অ্যাস্ট্রেজেনেকার পুরো তথ্য আমাদের হাতে এখনও এসে পৌঁছায়নি। তারা তো তাদের ট্রায়ালের রেজাল্ট প্রকাশ করেনি, তাছাড়া আরও অনেক কিছু রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদনও এখনও পায়নি। তাই আরও তথ্য দরকার, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদনের পর বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ সংস্থাও এ নিয়ে কাজ করবে।’

    ভ্যাকসিন অবশ্যই নিতে হবে মন্তব্য করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ভ্যাকসিন অন্তত কয়েকমাসের জন্য সুরক্ষা দেবে এটা মোটামুটি সুনিশ্চিত। তবে কেবলমাত্র ভ্যাকসিনের আশায় থেকে অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি না মেনে থাকা যাবে না।’

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
  • ফেসবুকে চিনাইরবার্তা.কম